বৈশ্বিক অস্থিরতায় স্ক্র্যাপের দাম এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা আরো সংকুচিত হয়েছে, যা খাতটির উৎপাদন সক্ষমতা ও বিনিয়োগ প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, সক্ষমতার ব্যবহার কমছে এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়ছে। চলতি বছরের ১৭ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামের শিপইয়ার্ডগুলোয় স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি হয়েছে মাত্র ১৫টি, যেখানে গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩৩টি। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ইয়ার্ডগুলোর কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে জাহাজ ভাঙা শিল্পের সংকট আরো ঘনীভূত পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে স্ক্র্যাপ জাহাজের দাম আরো বাড়বে। এতে ব্যবসায়ীদের বেশি দামে জাহাজ কিনতে হতে পারে, যার প্রভাবে দেশীয় বাজারে স্ক্র্যাপের দাম আরো ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্যমতে, চলতি বছরের ১৭ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামের গ্রিন শিপইয়ার্ডে কাটার জন্য সৈকতায়ন করা হয়েছে মাত্র ১৫টি স্ক্র্যাপ জাহাজ। এগুলোর সম্মিলিত ওজন ১ লাখ ৪০ হাজার ৮১৩ দশমিক ৬৮ টন। যদিও চলতি মাসে আরো একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ সৈকতায়ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে আসা আটটি জাহাজের সম্মিলিত ওজন ছিল ৬৩ হাজার ১২৬ দশমিক ৩১ টন। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে ৩৮ হাজার ১৮০ দশমিক ৬৫ টনের চারটি ও ১৭ মার্চ পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৫০৬ দশমিক ৭২ টনের তিনটি স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার জন্য আমদানি করেছেন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে মোট ৩৩টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হয়, যার সম্মিলিত ওজন ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৩১৩ টন। এদিকে ২০২৪ সালের একই সময়ে মোট ২ লাখ ৯১ হাজার ৫৬২ টনের ৩৮টি, ২০২৩ সালে মোট ৩ লাখ টনের ৫০টি, ২০২২ সালে মোট ৪ লাখ ৭১ হাজার ৩২৭ টনের ৪৪টি, ২০২১ সালে মোট ৮ লাখ ৯২ হাজার ৮১৫ টনের ৮৫টি এবং ২০২০ সালে মোট ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫৪ টনের ৫৯টি স্ক্র্যাপ জাহাজ সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন শিপইয়ার্ডে আনা হয়। অর্থাৎ বিগত সময়ের মধ্যে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সবচেয়ে কম আমদানি হয়েছে।
ইয়ার্ডগুলোয় ধারাবাহিকভাবে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি কমেছে। তবে গত বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম আমদানি হয়েছে চলতি বছরে। এভাবে চলতে থাকলে ২০২৬ সাল শেষে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি আরো নিম্নমুখী হতে পারে। ২০২৫ সালের জুন থেকে চলতি বছরের ১৭ মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে আমদানি হয়েছে মাত্র ৫৩টি জাহাজ, যার সম্মিলিত ওজন ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫২ টন। অর্থাৎ গ্রিন ইয়ার্ড বাধ্যতামূলক হওয়ার পর গড়ে প্রতি মাসে ছয়টি করে জাহাজ আমদানি করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এখন পর্যন্ত গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের কাজ সম্পন্ন করেছে ১৭টি ইয়ার্ড। আরো ছয়টি তালিকাভুক্তির শেষ ধাপে রয়েছে। ইয়ার্ড সংখ্যা কম থাকায় স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিও কম হচ্ছে। তবে নির্মাণাধীন গ্রীন ইয়ার্ডগুলোর কাজ শেষ হলে আমদানি অনেক বাড়বে।
ব্যবসায়ীদের শঙ্কা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি আরো কমে যাবে। অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে দেশের বাজারেও স্ক্র্যাপের দাম বাড়বে, যার প্রভাব সরাসরি ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়বে। তখন দেশীয় ক্রেতা বেশি দামে স্ক্র্যাপ ক্রয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। সব মিলিয়ে এ জাহাজ ভাঙা শিল্প খাত খুবই বেকায়দায় আছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
এদিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এবং এর প্রভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে স্ক্র্যাপ জাহাজের দাম বেড়েছে। যার কারণে নতুন করে আমদানিতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংকটে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত এক মাসের মধ্যে স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি বেড়েছে ৪-৫ হাজার টাকা।
স্ক্র্যাপের বাজারদরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, এক মাস আগেও জাহাজের স্ক্র্যাপ টনপ্রতি ৫৫ হাজার টাকা বিক্রি হলেও এখন হচ্ছে ৫৯-৬০ হাজার টাকায়। অন্যদিকে স্ক্র্যাপ জাহাজের প্লেট এক মাস আগে টনপ্রতি ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এখন হচ্ছে ৬৯-৭০ হাজার টাকায়। তবে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে টনপ্রতি স্ক্র্যাপের দাম দ্রুতই আরো বাড়তে পারে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্রিন শিপইয়ার্ড বাস্তবায়নের কারণে স্ক্র্যাপ জাহাজ কর্তন এখন সম্পূর্ণ মেশিনারিজ বা স্বয়ংক্রিয় হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে এক্সক্যাভেটর, জেনারেটর, ক্রেনসহ বিভিন্ন মেশিনারিজ পরিচালনায় প্রচুর জ্বালানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকটে পড়েছে দেশ। এমন পরিস্থিতিতে ইয়ার্ডের মেশিনারিজ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে সম্প্রতি ইয়ার্ডের কার্যক্রমও সীমিত করে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে নিয়মিতভাবে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটতে দেরি হওয়ায় প্রতিদিন ব্যাংকের সুদের পাশাপাশি অন্যান্য ব্যয়ও বাড়ছে। সার্বিকভাবে পরিস্থিতিতে স্ক্র্যাপের দাম আরো বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বিএসবিআরএর সদস্য ও জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান আরেফিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হোসাইনুন আরেফিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পড়েছে দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প খাত। এখন ইয়ার্ডগুলো গ্রিন শিপইয়ার্ডের তালিকাভুক্ত হওয়ায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কর্তন সম্পূর্ণটাই মেশিনারিজের মাধ্যমে করতে হয়। ইয়ার্ডে জাহাজ কাটতে হলে প্রতিদিন শত শত লিটার জ্বালানির প্রয়োজন; কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী পাচ্ছি না। সরকার জ্বালানি সরবরাহে রেশনিং পদ্ধতি বন্ধ করে দিলেও আমাদের প্রয়োজন মিটছে না।’
যদি একদিন ইয়ার্ডে জাহাজ বসে থাকলে কিংবা কোনো কারণে কাটা সম্ভব না হলে বড় অংকের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় বলে দাবি করেন এ ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘আমাদের জ্বালানি সরবরাহ মূলত পরিবহনের মাধ্যমে করতে হয়। যেখান থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করি, তাদের অনুরোধ করতে হচ্ছে। তারপরও চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছেন না। সংকটের কারণে পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় আমাদের খরচও বাড়ছে।’ অন্যদিকে সংকট চলমান ও বিভিন্ন ক্ষতির কারণে স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি সাড়ে ৭-৯ শতাংশ বেড়েছে বলে জানান হোসাইনুন আরেফিন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে বিএসবিআরএতে সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রশাসক আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহে দুল ইসলামের সঙ্গে কয়েক দফায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি।
বিএসবিআরএর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রায় ১১৬টি শিপইয়ার্ডের তালিকা থাকলেও বর্তমানে প্রাথমিক অনুমোদন রয়েছে ১০৫টির। এর মধ্যে ২৩টি গ্রিন ইয়ার্ডের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেও বাজেট সংকটে অধিকাংশই আধুনিকায়নের কাজ শুরু করতে পারেনি। এক যুগ আগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বরাদ্দকৃত নয়টি মৌজায় ১৮৫টি শিপইয়ার্ড নিবন্ধিত ছিল।